ইবাদত প্রথমত কত প্রকার?



light mode



মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ইবাদত করা । দৈনন্দিন জীবনে মানুষ মহান আল্লাহর আদেশ যেমন- সালাত, সাওম, হজ, যাকাত পালন করা এবং নিষেধ যেমন- সুদ, ঘুষ, বেপর্দা, বেহায়াপনা ইত্যাদি পরিহার করে চলাকে ইবাদত বলে । তেমনিভাবে নবি ও রাসুলের দেখানো পথ অনুযায়ী একে অপরের সাথে উত্তম আচার ব্যবহার করাও ইবাদত। মূলত ইবাদতের মাধ্যমে মহান আল্লাহর আনুগত্য ও দাসত্ব প্রকাশ করা হয় । এর মধ্যেই মানুষের কল্যাণ নিহিত রয়েছে ।

এ অধ্যায় পাঠ শেষে আমরা -

  • হাক্কুল্লাহ (স্রষ্টার প্রতি কর্তব্য) ও হাক্কুল ইবাদ (সৃষ্টির প্রতি কর্তব্য) এর ধারণা লাভ করবো এবং এগুলো আদায়ের পদ্ধতি বর্ণনা করতে পারব;
  • হাক্কুল্লাহ (স্রষ্টার প্রতি কর্তব্য) ও হাক্কুল ইবাদ (সৃষ্টির প্রতি কর্তব্য) চিহ্নিত করে বাস্তব জীবনে এর যথাযথ প্রয়োগ করতে পারব;
  • সালাতের পরিচয় ও গুরুত্ব বর্ণনা করতে পারব;
  • সাওমের (রোযার) গুরুত্ব ও শিক্ষা বর্ণনা করতে পারব;
  • যাকাতের ভূমিকা ও গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে পারব; হজের ধারণা ও নিয়মাবলি বর্ণনা করতে পারব;
  • ভ্রাতৃত্ববোধ, শৃঙ্খলাবোধ ও নৈতিকতা অর্জনে হজের শিক্ষা বর্ণনা করতে পারব;
  • অসহায় ও দরিদ্রের অধিকার বর্ণনা করতে পারব;
  • মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে পারব;
  • ইলম (জ্ঞান) এর ধারণা, প্রকারভেদ ও গুরুত্ব বর্ণনা করতে পারব;
  • শিক্ষার্থীর বৈশিষ্ট্য ও শিক্ষকের গুণাবলি বর্ণনা করতে পারব;
  • ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক এবং শিক্ষা ও নৈতিকতার ধারণা বর্ণনা করতে পারব;
  • জিহাদের ধারণা, প্রকারভেদ ও গুরুত্ব বর্ণনা করতে পারব;
  • জিহাদ ও সন্ত্রাসবাদের পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে পারব এবং সন্ত্রাসবাদের কুফল বর্ণনা করতে পারব;
  • জিহাদ ও সন্ত্রাসবাদের পার্থক্য অনুধাবন করে সন্ত্রাসমুক্ত মানবতাবাদী জীবনযাপনে সচেষ্ট হতে পারব;
  • মৌলিক ইবাদতগুলো পালনের মাধ্যমে নৈতিক ও মানবিক জীবন গঠনে অগ্রসর হতে পারব ।

 

পাঠ ১ ইবাদত

ইবাদত আরবি শব্দ । এর অর্থ হলো চূড়ান্তভাবে দীনতা-হীনতা ও বিনয় প্রকাশ করা এবং নমনীয় হওয়া । আর ইসলামি পরিভাষায় দৈনন্দিন জীবনের সকল কাজ-কর্মে আল্লাহ তায়ালা

মেনে চলাকে ইবাদত বলা হয় । আল্লাহ তায়ালা আমাদের সৃষ্টি করে এ পৃথিবীতে সহজভাবে জীবনযাপন করার জন্য অসংখ্য নিয়ামত দান করেছেন ।

আমরা আল্লাহর বান্দা। তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা আমাদের অবশ্য কর্তব্য । আল্লাহ তায়ালা আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলেছেন,

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ 

অর্থ : “জিন ও মানবজাতিকে আমি (আল্লাহ) আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি ।” (সূরা আয্-যারিয়াত, আয়াত ৫৬)

আমরা পৃথিবীতে যত ইবাদতই করি না কেন, সকল ইবাদতের মূল উদ্দেশ্যই হলো মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা । আর এ ইবাদত একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর জন্য না হলে আল্লাহ তা কবুল করবেন না । আল্লাহ তায়ালা বলেন- “তারাতো আদিষ্ট হয়েছিল আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধ চিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে তাঁর ইবাদত করতে ।” (সূরা আল-বাইয়্যিনা, আয়াত ০৫)

কীভাবে ইবাদত করলে ও জীবনযাপন করলে আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্ট হবেন, তা শেখানোর জন্য নবি-রাসুলগণ প্রেরিত হয়েছিলেন । আল্লাহ তায়ালা তাঁদের অনুসরণ করতে পবিত্র কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন । মহান আল্লাহ বলেন, “(হে নবি!) আপনি বলুন, তোমরা আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য কর, যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে জেনে রাখুন, আল্লাহ তো কাফিরদের পছন্দ করেন না ।” (সূরা আলে-ইমরান, আয়াত ৩২)

উক্ত আয়াত থেকে আমরা বুঝলাম আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কর্তৃক নির্দেশিত পথ ও মত অনুসরণ করার নাম ইবাদত । সুতরাং তাঁদের নির্দেশিত কাজগুলো যথাযথভাবে সম্পাদন করতে পারলে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে সক্ষম হব ।

ইবাদতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য হলো বিবেক-বুদ্ধি ও জ্ঞানের । যদি মানুষ সে বিবেক-বুদ্ধি ও জ্ঞান দিয়ে আল্লাহর ইবাদত করতে না পারে তাহলে সে চতুষ্পদ জন্তু কিংবা তার চেয়েও অধম হয়ে যায় । আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দ্বারা তারা উপলব্ধি করে না । তাদের চক্ষু আছে তা দ্বারা দেখে না, তাদের কর্ণ আছে তা দ্বারা শুনে না; এরা পশুর ন্যায় । বরং অধিক নিকৃষ্ট (পশু হতে); তারা হলো অচেতন।” (সূরা আল-আরাফ, আয়াত ১৭৯) । অতএব ইবাদত বলতে শুধু উপাসনাকেই বুঝায় না । বরং আল্লাহর খলিফা (প্রতিনিধি) হিসেবে সকল কার্য আল্লাহর বিধানমতো

করাই হলো ইবাদত । আল্লাহ তায়ালা বলেন- فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلوةُ فَانْتَشِرُ وا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللهِ وَاذْكُرُوا اللهَ كَثِيرًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ )

অর্থ : “সালাত আদায় করার পর তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়বে । আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে ব্যাপৃত হবে এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করবে । যাতে তোমরা সফলকাম হও ।” (সূরা আল-জুমুআ, আয়াত ১০)

এ আয়াতের মর্ম থেকে বোঝা যায় যে, আল্লাহর আদিষ্ট কাজগুলো পরিপূর্ণভাবে আদায় করে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি ও কৃষিকাজ করা এবং বৈধ পন্থায় সম্পদ উপার্জন ও দুনিয়ার অন্যান্য সকল ভালো কাজ করা ইবাদত। এমনিভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ভালোবাসা, তাঁর রহমতের আশা, শাস্তির ভয়, ইখলাস, সবর, শোকর, তাওয়াক্কুল ইত্যাদি সব কাজই ইবাদতের মধ্যে শামিল ।

আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (স.)-এর প্রদর্শিত পন্থা যথাযথভাবে অনুসরণ করলে পরকালে আল্লাহ আমাদের পুরস্কৃত করবেন । ফলে দুনিয়া ও আখিরাতে আমরা শান্তি পাব ।

হাক্কুল্লাহ ও হাক্কুল ইবাদ

ইবাদত প্রধানত দুই প্রকার : (ক) হাক্কুল্লাহ ও (খ) হাক্কুল ইবাদ ।

(ক) হাক্কুল্লাহ (আল্লাহর হক)

আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত অধিকার বা কর্তব্যকে হাক্কুল্লাহ বলে । আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য অনেক ধরনের ইবাদত (কাজ) করি । সেগুলোর মধ্যে কিছু ইবাদত শুধু আল্লাহ তায়ালার জন্য নির্দিষ্ট, এগুলো হলো হাক্কুল্লাহ, যেমন- সালাত (নামায) কায়েম করা, সাওম (রোযা) পালন ও হজ করা ইত্যাদি । এসব কাজ করার পূর্বে প্রত্যেক মানুষকে অন্তর থেকে যা বিশ্বাস করতে হবে তা হলো- আল্লাহ আছেন, তিনি এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো শরিক (অংশীদার) নেই, তিনিই সবকিছুর স্রষ্টা । তাঁর আদেশেই পৃথিবীর সবকিছু আবার ধ্বংস হবে । আমাদের জীবন-মৃত্যু সবই তাঁর হাতে । পৃথিবীর সবকিছুই তাঁর জ্ঞানের আওতাভুক্ত । তাঁর হাতেই সকল সৃষ্টির রিজিক। আমরা তাঁরই ইবাদতকারী । তিনি ব্যতীত উপাসনার উপযুক্ত আর কেউ নেই । এ সবকিছু মনে প্রাণে বিশ্বাস করা ও স্বীকার করাই হলো বান্দার উপর আল্লাহর হক ।

আল্লাহর হক আদায় করতে হলে আমাদের অবশ্যই নিম্নোক্ত কাজগুলো করতে হবে :

১. সামগ্রিক জীবনে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও কর্তৃত্ব স্বীকার করা ।

আল্লাহর দেওয়া সকল আদেশ-নিষেধ মেনে চলা ।

৩. . সর্বাবস্থায় নিজেকে আল্লাহর নিকট সমর্পণ এবং তাঁর অনুগ্রহ কামনা করা । আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনে আল্লাহর বিধানগুলো মেনে চলব; তাতে তিনি আমাদের উপর সন্তুষ্ট হবেন । ফলে আমরা পরকালে তাঁর থেকে পুরস্কার পাব ।

(খ) হাক্কুল ইবাদ (বান্দার হক)

মানুষ সামাজিক জীব । সমাজবদ্ধ হয়েই মানুষকে বসবাস করতে হয়। আমরা পিতা-মাতা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের নিয়ে সামাজিকভাবে একসাথে বসবাস করি । একজনের দুঃখে অন্যজন সাড়া দেই । আপদে-বিপদে একে-অপরকে সাহায্য সহযোগিতা করি । পরস্পরের প্রতি এই সহানুভূতি ও দায়িত্বই হাক্কুল ইবাদ (বান্দার হক বা অধিকার) । কুরআন ও হাদিসের মাধ্যমে জানা যায় যে, ইসলামে বান্দার হক তথা মানবাধিকারের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ।

 মানবাধিকার সম্পর্কে অসংখ্য আয়াত ও হাদিস রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, নিশ্চয় তোমার উপর তোমার প্রতিপালকের, তোমার শরীরের, তোমার স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির হক রয়েছে । অন্যত্র রাসুলুল্লাহ (স.) আরও বলেছেন,“এক মুসলিমের উপর অপর মুসলিমের ছয়টি অধিকার রয়েছে । যেমন- সালামের জবাব দেওয়া, রোগীকে দেখতে যাওয়া, জানাযায় অংশগ্রহণ করা, দাওয়াত কবুল করা, মজলুমকে সাহায্য করা ও হাঁচির জবাব দেওয়া ।” (বুখারি ও মুসলিম)

মানুষের প্রতি মানুষের হক বা অধিকারকে আটটি ভাগে ভাগ করা যায়, যেমন : (১) নিকটাত্মীয়ের হক, (২) দূরাত্মীয়ের হক, (৩) প্রতিবেশীর হক, (৪) দেশবাসীর হক, (৫) শাসক-শাসিতের হক, (৬) সাধারণ মুসলমানের হক, (৭) অভাবী লোকের হক এবং (৮) অমুসলিমের হক ।

আমরা আল্লাহর হক পালন করার সাথে সাথে মানুষের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে সচেষ্ট হব । কাজ : শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে আল্লাহর হক ও বান্দার হক সম্পর্কিত প্রতিটির উপর তিনটি করে উদাহরণ তৈরি করবে ।



        ইবাদত কি | 

ইবাদত (اُلْعِبَـادَةُ) কি?

ইবাদত (اُلْعِبَـادَةُ) আরবি শব্দ৷ এর অর্থ হল চূড়ান্তভাবে দীনতা হীনতা ও বিনয় প্রকাশ করা এবং নমনীয় হওয়া৷ আর ইসলামি পরিভাষায় দৈনন্দিন জীবনের সকল কাজ কর্মে আল্লাহ তায়ালার বিধি বিধান মেনে চলাকে ইবাদত বলা হয়৷ আল্লাহ তায়ালা আমাদের সৃষ্টি করে এ পৃথিবীতে সহজভাবে জীবনযাপন করার জন্য অসংখ্য নিয়ামত দান করেছেন৷

আমরা আল্লাহর বান্দা৷ তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা আমাদের অবশ্য কর্তব্য৷ আল্লাহ তায়ালা আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলেছেনঃ
وَمَـاخَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْاِنْسَ اِلَّالِيَعْدُوْنِ ٥

অর্থঃ জিন ও মানবজাতিকে আমি (আল্লাহ) আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি৷ (সূরা আয যারিয়িত আয়াত ৫৬)।

আমরা পৃথিবীতে যত ইবাদতই করি না কেন সকল ইবাদতের মূল উদ্দেশ্যই হল মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা৷ আর এ ইবাদত একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর জন্য না হলে আল্লাহ তা কবুল করবেন না৷ আল্লাহ তায়ালা বলেন তারাতো আদিষ্ট হয়েছিল আল্লাহর আনুগত্য বিশুদ্ধ চিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে তাঁর ইবাদত করতে৷ (সূরা আল বাইয়্যিনা আয়াত ০৫)।

ইবাদত
ইবাদত

কীভাবে ইবাদত করলে ও জীবনযাপন করলে তায়ালা সন্তুষ্ট হবেন তা শেখানোর জন্য নবি রাসুলগণ প্রেরিত হয়েছিলেন৷ আল্লাহ তায়ালা তাঁদের অনুসরণ করতে পবিত্র কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন৷ মহান আল্লাহ বলেন (হে নবি) আপনি বলুন তোমরা আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য কর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে জেনে রাখুন আল্লাহ তো কাফিরদের পছন্দ করেন না৷ (সূরা আলে ইমরান আয়াত ৩২)।

উক্ত আয়াত থেকে আমরা বুঝলাম আল্লাহ ও রাসুল কর্তৃক নির্দেশিত পথ ও মত অনুসরণ করার নাম ইবাদত৷ সুতরাং তাঁদের নির্দেশিত কাজগুলো যথাযথভাবে সম্পাদন করতে পারলে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে সক্ষম হব৷

ইবাদতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য কি কি?

আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য হল বিবেক বুদ্ধি ও জ্ঞানের৷ যদি মানুষ সে বিবেক বুদ্ধি ও জ্ঞান দিয়ে আল্লাহর ইবাদত করতে না পারে তাহলে সে চতুষ্পদ জন্তু কিংবা তার চেয়েও অধম হয়ে যায়৷ আল্লাহ তায়ালা বলেন তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দ্বারা তারা উপলব্ধি করে না৷ 

তাদের চক্ষু আছে তা দ্বারা দেখে না তাদের কর্ণ আছে তা দ্বারা শুনে না এরা পশুর ন্যায়৷ বরং অধিক নিকৃষ্ট (পশু হতে)  তারা হল অচেতন৷ (সূরা আল আরাফ আয়াত ১৭৯)। অতএব ইবাদত করতে বলতে শুধু উপাসনাকেই বুঝায় না৷ বরং আল্লাহর খলিফা (প্রতিনিধি) হিসেবে সকল কার্য আল্লাহর বিধানমতো করাই হল ইবাদত৷ আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ
فَـاِذَاقُضِيَتِ الصَّلٰوةُ فَـانْتَشِرُوْافِى الْاَرْضِ وَابْتَغُوْامِـنْ فَضْلِ اللّٰهِ وَاذْكُرُوا اللّٰهَ كَثِيْرًالَّعَلَّـكُمْ تُفْلِحُوْنَ ٥

অর্থঃ সালাত আদায় করার পর তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়বে৷ আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে ব্যাপৃত হবে এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করবে৷ যাতে তোমরা সফলকাম হও৷ (সূরা আল জুমুআ আয়াত ১০)।

এ আয়াতের মর্ম থেকে বোঝা যায় যে আল্লাহর আদিষ্ট কাজগুলো পরিপূর্ণভাবে আদায় করে ব্যবসা বাণিজ্য চাকরি ও কৃষিকাজ করা এবং বৈধ পন্থায় সম্পদ উপার্জন ও দুনিয়ার অন্যান্য সকল ভালো কাজ করা ইবাদত৷ এমনিভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ভালোবাসা তাঁর রহমতের আশা শাস্তির ভয় ইখলাস সবর শোকর তাওয়াক্কুল ইত্যাদি সব কাজেই ইবাদতের মধ্যে শামিল৷

আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (স.) এন প্রদর্শিত পন্থা যথাযথভাবে অনুসরণ করলে পরকালে আল্লাহ আমাদের পুরস্কৃত করবেন৷ ফলে দুনিয়া ও আখিরাতে আমরা শান্তি পাব৷

ইবাদত কত প্রকার ও কি কি?

হাক্কুল্লাহ ও হাক্কুল ইবাদত দুই প্রকারঃ
  • হাক্কুল্লাহ ও
  • হাক্কুল ইবাদ

হাক্কুল্লাহ (আল্লাহর হক) কি?

আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত অধিকার বা কর্তব্যকে হাক্কুল্লাহ (ِحَقُّ اللّٰه) বলে৷ আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য অনেক ধরনের ইবাদত (কাজ) করি৷ সেগুলোর মধ্যে কিছু ইবাদত শুধু আল্লাহ তায়ালার জন্য নির্দিষ্ট এগুলো হল হাক্কুল্লাহ যেমন সালাত (নামায) কায়েম করা সাওম (রোযা) পালন ও হজ করা ইত্যাদি৷ 

এসব কাজ করার পূর্বে প্রত্যেক মানুষকে অন্তর থেকে যা বিশ্বাস করতে হবে তা হল আল্লাহ আছেন তিনি এক ও অদ্বিতীয় তাঁর কোন শরিক (অংশীদার) নেই তিনিই সবকিছুর স্রষ্টা৷ তাঁর আদেশেই পৃথিবীর সবকিছু আবার ধ্বংস হবে৷

আমাদের জীবন মৃত্যু সবই তাঁর হাতে৷ পৃথিবীর সবকিছুই তাঁর জ্ঞানের আওতাভুক্ত৷ তাঁর হাতেই সকল সৃষ্টির রিজিক৷ আমরা তাঁরই ইবাদতকারী৷ তিনি ব্যতীত উপাসনার উপযুক্ত আর কেউ নেই৷ এ সবকিছু মনে প্রাণে বিশ্বাস করা ও স্বীকার করাই হল বান্দার উপর আল্লাহর হক৷

আল্লাহর হক আদায় করতে হলে আমাদের অবশ্যই নিম্নোক্ত কাজগুলো যথাযথ সময় করতে হবে যেমনঃ
  • সামগ্রিক জীবনে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও কর্তৃত্ব স্বীকার করা৷
  • আল্লাহর দেওয়া সকল আদেশ নিষেধ মেনে চলা৷
  • সর্বাবস্থায় নিজেকে আল্লাহর নিকট সমর্পণ এবং তাঁর অনুগ্রহ কামনা করা৷
আমাদের ব্যক্তিগত পারিবারিক সামাজিক অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনে আল্লাহর বিধানগুলো মেনে চলব তাতে তিনি আমাদের উপর সন্তুষ্ট হবেন৷ ফলে আমরা পরকালে তাঁর থেকে পুরস্কার পাব৷

হাক্কুল ইবাদ (বান্দার হক) কি?

মানুষ সামাজিক জীব৷ সমাজবদ্ধ হয়েই মানুষকে বসবাস করতে হয়৷ আমরা পিতা মাতা ভাই বোন আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশীদের নিয়ে সামাজিকভাবে একসাথে বসবাস করি৷ একজনের দুঃখে অন্যজন সাড়া দেই৷ আপদে বিপদে একে অপরকে সাহায্য সহযোগিতা করি৷ পরস্পরের প্রতি এই সহানুভূতি ও দায়িত্বই হাক্কুল ইবাদ (ِحَقُّ الْعِبَـاد) ( বান্দার হক বা অধিকার)। 

কুরআন ও হাদিসের মাধ্যমে জানা যায় যে ইসলামে বান্দার হক তথা মানবাধিকারের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে৷ মানবাধিকার সম্পর্কে অসংখ্য আয়াত ও হাদিসে রয়েছে৷ রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন নিশ্চয় তোমার উপর তোমার প্রতিপালকের তোমার শরীরের তোমার স্ত্রী ও সন্তান সন্ততির হক রয়েছে৷ 

অন্যত্র রাসুলুল্লাহ (স.) আরও বলেছেন এক মুসলিমের উপর অপর মুসলিমের ছয়টি অধিকার রয়েছে৷ যেমন সালামের জবাব দেওয়া রোগীকে দেখতে যাওয়া জানাযায় অংশগ্রহণ করা দাওয়াত কবুল করা মজলুমকে সাহায্য করা ও হাঁচির জবাব দেওয়া৷ (বুখারি ও মুসলিম)

মানুষের প্রতি মানুষের হক বা অধিকারকে আটটি ভাগে ভাগ করা যায় যেমনঃ
  • নিকটাত্মীয়ের হক
  • দূরাত্মীয়ের হক
  • প্রতিবেশীর হক
  • দেশবাসীর হক
  • শাসক শাসিতের হক
  • সাধারণ মুসলমানের হক
  • অভাবী লোকের হক এবং
  • অমুসলিমের হক।

Comments